Travel

মধু হই হইঃ বগা লেক টু নীলাচল

March 13, 2017
ঋজুক ঝর্ণা

শরীরের ব্যাথা এখনো আছে।

ভোর পাচটায় লারামকে খিচুড়ি আর ডিম বাজা করে রাখতে বলা হয়েছিলো। এখান থেকে খেয়েই আমরা রৌণা দিবো। গাইড আনোয়ার গতকালই একটা চান্দের গাড়ি ঠিক করে রেখেছেন। আমাদের বগা লেক পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে কমলা বাজার থেকে চান্দের গাড়িতে উঠতে হবে।

কথা মতো আমরা সবাই ঘুম থেকে উঠে ব্যাগ গুছিয়ে নিচে নেমে এলাম। সকালের খাবার খেয়ে আমরা যাত্রা শুরু করবো।

১৫ মার্চ রাতে তিন দিনের জন্য আমাদের ভ্রমণ শুরু হয়েছিলো। আজ ১৮ মার্চ। আমাদের ভ্রমণের শেষ দিন। ঢাকা পৌছাবো কাল ভোরে।

আজ আর গোসল করিনি। বান্দরবান শহরে গিয়ে বাসে উঠার আগে একটা হোটেলে উঠে গোসল করে নিবো। আর সকালে শীতের পরিমানও বেশি ছিলো। চাইলেও এতো ভোরে বগা লেক-এ গোসল করা সম্ভব ছিলো না।

লারামের রান্না করা খিচুড়ি আর ডিম ভাজা খেয়ে তার টাকা পরিশোধ করে তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা কমলা বাজার এর উদ্দেশ্যে রৌণা দিলাম। সবার হাতে যথারীতি আবার বাশ। কারন, আমাদের আবার পাহাড় বেয়ে নিচে নামতে হবে।

আজ আমরা যাবো ঋজুক ঝর্ণা, মেঘলা এবং নীলাচল।

বগা লেক থেকে পাহাড় বেয়ে নামতে গিয়ে দেখলাম কিছু কিছু রাস্তা খুবই বিপদজনক। অনেক সতর্ক না হলে যে কোন সময় বিপদ হয়ে যেতে পারে। কিছু রাস্তা খুবই সরু আবার সাথে সাথে অনেক খাড়া। আর বাম দিকে গভীর ঢালু।

তাই সতর্ক না হলে বাম দিকে পরে যাওয়ার ঝুকি থাকে। আর শরীরের ব্যালেন্স রাখা খুবই কষ্টকর হয়ে পরে কারন হলো নিচের দিকে অনেক ঢালু থাকাতে শরীরের সমস্ত ভার নিচের দিকে চলে যায়।

তবে এক্ষেত্রে খুবই সহায়ক ভূমিকা হিসেবে বাশ উপকারে লাগছে। সামনে বাশ ফেলে ফেলে তার উপর ভর দিয়ে আমরা নিচে নামছি। এতো সতর্কতার মধ্যেও আমাদের কয়েকজন সঙ্গী স্লিপ করে পরে গেছেন। তবে ভাগ্য ভালো নিচে পরে যান নি।

আমাদের বগা লেক এর উপর থেকে নিচে কমলা বাজার আসতে ত্রিশ মিনিটের মত সময় লেগেছে।

চান্দের গাড়ি রেডি ছিলো। আমরা সবাই গাড়িতে উঠলাম। ভিতরে আমরা দশজন বসেছি। গাইড আনোয়ার গাড়ির ছাদে উঠেছেন।

আমাদের রুমার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হলো।

একটু যেতে না যেতেই আমরা বিপদের মধ্যে পড়লাম। মালবাহী একটা চান্দের গাড়ী বিকল হয়ে দাড়িয়ে আছে।

আমার সাথের সঙ্গীরা আমার দিকে বিরক্তিভাব নিয়ে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু কিছু বলছেন না। আমি মুখ ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে থাকলাম। বুঝতে পারলাম, তারা এই বিড়ম্ভনার জন্য মনে মনে আমাকে দায়ী করছেন কিন্তু মুখে বলতে পারছেন না।

ঢাকা থেকে আসার দিন বাসেও প্রবলেম হয়েছিলো। একঘন্টা লেট হয়েছিলো সেজন্য। তারা জানতো আমি যেখানেই থাকি সেখানে কিছু ঝামেলা হবেই। আর সেজন্যই তারা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

আজ আমাদের সময় খুবই কম। এতদূর এসে যদি কোন লোকেশন দেখা অপূর্ণ থেকে যায় তাহলে মন খারাপ হওয়াটা স্বাভাবিকই।

আমাদের সাথে দুইজন অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তারা নেমে গেলেন। সাথে অন্যরাও নামলেন।

আমি আর তাদের সাথে গেলাম না। সেখানে গেলে আবার না কোন ঝামেলা হয় তাই গাড়িতেই বসে থাকলাম।

দূর থেকে দেখলাম তারা কিছু চেক করছে। কিছুক্ষণ পর সবাই মিলে গাড়িটাকে ধাক্কা দিয়ে সামনে একটা জায়গায় রেখে সবাই হেটে আসছেন। সমতল থাকাতে গাড়িটাকে ধাক্কা দিয়ে নিতে পেরেছেন। কিন্তু ঢালু হলে আর সম্ভব ছিলো না।

সবাই গাড়িতে উঠলেন। আমাদের চান্দের গাড়ি আবার চলা শুরু করেছে।

আমরা রুমাতে চলে আসলাম। এখন আমাদের প্রথমে যেতে হবে আর্মি ক্যাম্পে।

১৬ মার্চ আমরা এখান থেকেই আমাদের তিন দিনের অভিযান শুরু করেছিলাম। আজ আমাদের এখানে এসে নাম এন্ট্রি করলেই আমরা যে ফিরে এসেছি তার রেকর্ড হয়ে যাবে। আমরা দল বেধে সবাই আর্মি ক্যাম্পে গেলাম। একে একে সবাই নাম বলে সাইন করে নেমে আসলাম।

এখন আমরা ইঞ্জিন চালিত নৌকা ভাড়া করে ঋঝুক ঝর্ণা যাবো।

ঘাটে গিয়ে দেড় হাজার টাকা দিয়ে ট্রলার ভাড়া করলাম। গাইড আনোয়ারকে তার পারিশ্রমিক দিয়ে বিদায় করে দিলাম। তবে তাকে একটা কাজ দেয়া হয়েছে। রুমা থেকে বান্দরবান যাওয়ার গাড়ির টিকেট রিজার্ভ দেওয়ার জন্য।

আসার দিন অনেক কষ্টে এসেছিলাম। তাই এবার তাকে আগে আগেই টিকেট বুকিং দিতে বলে দিলাম। আমরা ঋঝুক থেকে ফিরে রুমা এসে লাঞ্চ করে গাড়িতে উঠবো। তখন তার কাছ থেকে টিকিট নিয়ে নিবো।

ট্রলারে করে সাঙ্গু নদী দিয়ে ঋঝুক ঝর্ণার উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছে। হাটু সমান পানি। কিন্তু খুবই স্বচ্ছ। পানির নিচে তাকালেই সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

সরু নদী। নদীর দুই পাশে পুরুষ-মহিলা, ছোট ছেলেমেয়েরা গোসল করছে। এতো পরিষ্কার পানি দেখে নামতে ইচ্ছে করছে। হাত দিয়ে পানি স্পর্শ করলাম। মাথার উপরে সূর্যের তাপ প্রচন্ড হলেও নদীর পানি বেশ ঠান্ডা। পানি দিয়ে মুখ ধোয়ে ঠান্ডা হয়ে নিলাম।

ট্রলার আস্তে আস্তে চলছে। কিছু জায়গা ছাড়া নদীর বেশির ভাগই অগভীর। একটু পর পরই ট্রলার নিচের তলদেশের সাথে লেগে যাচ্ছে। তখন ট্রলারের মাঝি নেমে ধাক্কা দিয়ে আবার ট্রলার চালান। নদীর দুই ধারে শুধু তামাকের সবুজ পাতা দেখা যাচ্ছে। অন্য ফসলের তুলনায় তামাকের চাষ অনেক বেশি।

জমিতে কৃষকদের কাজ করতে দেখছি। আবার নদীর ধারে ছোট ছেলেমেয়েকে বালি দিয়ে ঘর বানাতেও দেখা যাচ্ছে। ট্রলারের ডেউ গিয়ে সেই ঘর ভেঙে যাচ্ছে।

নদীর উপর দিয়ে মানুষকে হাতে জুতা নিয়ে হেটে পার হতে দেখা যাচ্ছে। এমন দৃশ্য অনেকদিন ধরে দেখা হয় না। ছোট সময় যখন বাড়িতে ছিলাম তখন নদীতে গেলে এইসব দৃশ্য দেখতে পেতাম। তবে কখনও নদীর উপর দিয়ে হেটে যেতে দেখিনি।

দেখতে দেখতে আমরা ঋঝুক ঝর্ণা চলে আসলাম।

চিংড়ি ঝর্ণা থেকে এখানে পানির প্রবাহ অনেক বেশি। এতো পানি পরতে দেখে সবাই আনন্দে লাফালাফি করে ট্রলার থেকে নেমেই ঝর্ণার কাছে গেলেন। কাপড় চেইঞ্জ করে সবাই ঝর্ণার নিচে গিয়ে চিৎকার করছেন। দুই দিকে হাত প্রসারিত করে ছবির জন্য পোজ দিচ্ছেন।

অনেক উপর থেকে ঝর্ণার পানি পরছে। পাথরের উপর শেওলা জমে পিচ্ছিল হয়ে আছে। আর যেখানটায় পানি পরছে সেখানে একটা গোলাকার গর্তের মত সৃষ্টি হয়েছে। সেখান থেকে পানি সাঙ্গু নদীতে আসে।

পা টিপে টিপে ঝর্ণার পানি যেখানে পরছে তার নিচে গেলাম। খুবই ঠান্ডা মনে হলো। ঝর্ণার পানি ফোটা হয়ে যখন শরীরের উপর পড়ছে তখন মনে হচ্ছে শরীরে বিধে যাচ্ছে।  মনে হলো শরীরের মধ্যে গর্ত হয়ে যাচ্ছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ঠান্ডা লাগতে শুরু করেছে। তাই আর বেশিক্ষণ না থেকে সাঙ্গু নদীতে সাতার কাটতে চলে এলাম। সবাই মিলে প্রতিযোগিতা করে কে আগে নদী পার হতে পারে তা শুরু হলো। মনে হলো আমরা এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে নদী পার হয়ে গেছি। নদী পেরিয়ে ওপারে গিয়ে দৌড় প্রতিযোগিতাও হলো।

আধা ঘন্টা থেকে আমরা আবার রামুর উদ্দেশ্যে রৌণা দিলাম। গাইড আনোয়ারের আগে থেকেই রামু ঘাটে ছিলো। দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য একটা ভালো হোটেলে নিয়ে গেলো।

আমাদের টিকেট কাটা হয়ে গেছে। তিনটার সময় রামু থেকে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে বাস ছাড়বে। হাতে আছে এক ঘন্টা। খেয়েই আমরা চান্দের গাড়িতে উঠে বাস স্ট্যান্ডে গেলাম। বাসে উঠার কিছুক্ষণ পরেই বাস ছেড়ে দিলো।

আসার দিন ডানে বামে তাকিয়ে দেখে দেখে রুমাতে এসেছিলাম। কিন্তু আজ এতো ক্লান্ত লাগছে যে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছি তা টেরই পাইনি।

কোলাহল শুনে ঘুম ভাঙলো। তাকিয়ে দেখি বাস দাড়িয়ে আছে। জানতে পারলাম, বাসের সামনে ডান পাশের চাকা সমস্যা হয়েছে। সাথে এক্সট্রা চাকাও নেই। ড্রাইভার জানালেন খুবই আস্তে আস্তে বান্দরবান যেতে হবে। বাস খুবই ধীরে ধীরে চলতে শুরু করেছে।

এদিকে বিকেল হয়ে গেছে। সূর্য আর বেশিক্ষণ থাকবে বলে মনে হচ্ছে না। আমাদের বান্দরবান গিয়ে মেঘলা আর নীলাচল ঘুরা হবে কিনা সেই চিন্তায় সবাই মন খারাপ করে আছেন।

আর বিরক্তিভাব নিয়ে সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তাদের তাকানো দেখে খুব খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে আমি নিজে বাসের চাকা নষ্ট করেছি।

এদিকে ভয়ও লাগছে পাহাড়ের উপর দিয়ে বাস চলছে। যদি কখনও বাসের চাকা খোলে যায় বা ব্যালেন্স না থাকে তাহলে বাসতো পাহাড় থেকে নিচে পরে যেতে পারে। যদি তাই হয় তাহলে সবার ভয়ানক বিপদ হতে পারে।

ভয়ে ভয়ে আমরা বান্দরবান এসে পৌছলাম। আর আমরা হাফ ছেড়ে বাচলাম।

মেঘলা আর নীলাচল দেখার জন্য আমরা তাড়াতাড়ি একটা চান্দের গাড়ি ভাড়া করলাম বারোশ টাকা দিয়ে। আমাদের ঘুরিয়ে আবার এখানেই নামিয়ে দিয়ে যাবে।

মেঘলা গিয়ে মানুষের ভিড় দেখতে পেলাম। আমাদের যেহেতু সময় কম তাই কোথাও বসে বা দাড়িয়ে না থেকে দ্রুত হাটতে লাগলাম। উচু-নিচু পাহাড় হেটে ক্লান্ত লাগছে।

হাটতে হাটতে পেপে-কলা বিক্রি করতে দেখলাম। একটা বড় পেপে নিয়ে সবাই খেয়ে নিলাম। খুবই মিষ্টি লাগলো।

সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। পাহাড়ের উপর থেকে দেখতে খুবই ভালো লাগছে। আর এই সময়ে যে ছবিই তুলা হচ্ছে সবই ভালো আসছে। তাই সবাই কিছু ছবিও তুলে নিচ্ছেন।

দেখতে দেখতে আমাদের মেঘলা দেখা শেষ হয়ে গেল। এবার আমাদের নীলাচল যাওয়ার পালা।

সবাই আবার চান্দের গাড়িতে উঠে হই হই করে নীলাচলের দিকে যাচ্ছি।

নীলাচল যখন গিয়ে পৌছালাম তখন সূর্য প্রায় ডুবে যাচ্ছে। হাতে ক্যামেরা অন করাই ছিলো। তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে ছবি তুলা শুরু করলাম। এখান থেকে বান্দরবান পুরা শহরটা দেখা যায়। শহরটার ছবি নেয়ার চেষ্টা করলাম কিন্তু অন্ধকার দেখাচ্ছে। আলো কমে যাওয়াতে ছবি আর ভালো আসলো না।

হতাশ হয়ে ক্যামেরা ব্যাগে ঢুকাচ্ছি এমন সময় পাশ থেকে ডাক শুনতে পেলাম। তাকিয়ে দেখি আমাকেই ডাকছে। একটা কাপল তাদের ছবি তুলে দেয়ার জন্য অনুরুধ করছেন।

শুকনা হাসি দিয়ে তাদের মোবাইল সেটটা নিয়ে কয়েকটা ছবি তুলে দিলাম। তারা খুশি হয়ে ধন্যবাদ দিলেন। চলে আসার সময় শুনতে পেলাম, দেখেছো ভাইয়া কতো সুন্দর ছবি তুলেছেন। আর তুমি এতোক্ষণ ধরে কি তুলছিলে! মনটা ভালো হয়ে গেলো।

কিছুক্ষণ থেকে আমরা বান্দরবান শহরের উদ্দেশ্যে রৌণা দিলাম। আমাদের ঘুরাঘুরি শেষ হলো।

লক্ষ্য করলাম সবাই চুপচাপ।

আমরা যে দশ জন একসাথে ঘুরেছি তারা সবাই চাকরি করেন। কাজ করতে করতে হাপিয়ে উঠেছেন। তাই একটু নিজেকে রিফ্রেশ করে নেওয়ার জন্য এসেছেন। হয়তো মনে পড়ছে ঢাকাতে গিয়ে আবার সেই কর্মব্যস্ত জীবন কাটাতে হবে। অনুভূতিগুলো আস্তে আস্তে হারিয়ে যাবে!

উপরে তাকিয়ে দেখি সুন্দর চাদ উঠেছে। হালকা মিষ্টি চাদের আলোতে ভালো লাগছে।

চিংড়ি ঝর্ণা থেকে ‘মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা’ গানটা আমাদের খুব ভালো লাগছে।

শেষ বারের মতো সবাই আবার এই গানটা ধরলেন। যখনই মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা লাইনটা আসে তখনই সবাই গলা মিলান।

সবার মনেই কি লোকানো কিছু ব্যাথা আছে যে জন্য এই লাইনটা সবাই গেয়ে উঠেন?

You Might Also Like

No Comments

Leave a Reply

shares