Movie Review

ওয়াইল্ডঃ ৯৪ দিনে ১,১০০ মাইল ট্রেকিং

May 7, 2017
ওয়াইল্ড

৯৪ দিনে ১,১০০ মাইল ট্রেকিং। প্যাসিফিক ক্রেস্ট ট্রেইল এর দৈর্ঘ ২,৬৫০ মাইল। পাথরের পাহাড়, তুষার, গাছ-পালাহীন মরুভূমি, পানিহীন এবং প্রায় জনমানবহীন একটি ভয়াণক পথে ট্রেকিং করেছেন শেরিল স্ট্রেইড। ওয়াইল্ড মুভিতে ট্রেকিং এর পাশাপাশি ফ্ল্যাশ ব্যাকে অতীত কাহিনী আসাতে ভালো লেগেছে মুভিটি।

১৯৯৫ সালে তিনি যখন এই দীর্ঘ পথ ট্রেকিং করেন তখন তার বয়স ছিলো ২৬ বছর। পরে ২০১২ সালে তিনি তার এই অভিজ্ঞতার উপর একটি বই লিখেন ওয়াইল্ডঃ ফ্রম লস্ট টু ফাউন্ড অন দি প্যাসিফিক ক্রেস্ট ট্রাইলনামে।

বইটি প্রকাশিত হওয়ার পাচ মাস আগেই লেখিকা নিজে মেইল করে অভিনেত্রী রিজ উইদারস্পুনকে পাঠিয়ে দেন। তখন তিনি ভেবেছিলেন যদি এর উপর কখনো মুভি হয় তাহলে একমাত্র সেই এটার জন্য উপযুক্ত হবে।

আর রিজও দেরি না করে স্বত্ত কিনে নেন তার প্রডাকশন হাউজ থেকে মুভিটি বানানোর জন্য যেটা হবে তার নতুন প্রডাকশন হাউজের জন্য খুবই উপযুক্ত সূচনা।

পরে বইটি নিয়ে অনেক ভালো রেসপন্স হয় যখন এটা অপরা বুক ক্লাবে নির্বাচিত হয়। এবং শেষ পর্যন্ত মুভিটি ২০১৪ সালে রিলিজ হয়। আর তখন লেখিকার বয়স ছিলো ৩৮।

বইটি প্রকাশের পর যেমন প্রশংসিত হয় ঠিক তেমনি এর উপর যখন মুভি হয় সেটিও ভালো রেসপন্স পায়। মুভিটিতে স্ট্রেইড এবং তার মার চরিত্রে অভিনয়ের জন্য দুজনেই অস্কারে নমিনেশন পায়।

মুভিটি মোটামোটি ভালো আয়ও করে, ১৫ মিলিয়ন ডলার বাজেটের মুভিটি আয় করে প্রায় ৩৮ মিলিয়ন ডলার।

ডিরেক্টর জেন-মার্ক ভ্যালি বায়োগ্রাফিকাল এই মুভিটির শুরুটা ছিলো খুবই থ্রিলড। ঘন ঘন জোড়ে জোড়ে দম নেয়ার শব্দ। তারপরই হঠাৎ দেখা গেলো বা পায়ের ভুড়ো আঙুলের নখ উঠে রক্তাক্ত হয়ে গেছে।

সেটা টান দিয়ে তুলে ফেলতে গিয়ে এক পর্যায়ে তার পায়ের একটা বোট পাহাড়ের গভীর নিচে পড়ে যায় যেখান থেকে আর সেটা তুলে আনা সম্ভব না। পরে রাগে-ক্ষোভে যেটা ছিলো সেটাও ফেলে দেয়। এমন সময়ই মুভির নাম উঠে ওয়াইল্ড।

পরে মুভি যখন শুরু হয় তখন জানা যায় ঘঠনাটা ট্রেকিং এর ৩৬-তম দিনে হয়েছিলো। সেদিন ট্রেকিং করতে করতে তার মার কথা মনে পড়ছিলো।

তার মা যেদিন মারা গেছেন সেদিনের কথা সে ভাবতে গিয়ে আনমনা হয়ে পড়ে। নিজের দিকে তার খেয়াল ছিলো না। জানা যায়, বোট ফেলে দিয়ে ‘ইউএস ন্যাশনাল ফরেস্ট’ এর এক নাম্বার নিয়ম ভেঙেছে স্ট্রেইড।

বাংলাদেশে কয়েক বছর ধরে ভ্রমণ প্রেমীর সংখ্যা বাড়ছে। কক্সবাজার এবং সেন্টমার্টিংসহ বিভিন্ন ভ্রমণ স্থানে জীব-বৈচিত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, পরিবেশের উপর বিরুপ প্রভাব পড়ছে এসব নিয়ে প্রায়ই লেখালেখি হচ্ছে।

কিন্তু তেমন ফল হচ্ছে না। আবর্জনা যত্রতত্র ফেলে নোংরা করা, উচ্চ শব্দে মিউজিক বাজানোসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর কাজ করা হয়ে থাকে। আমাদের এখানে যদি কোন নিয়ম থেকে থাকে তাহলে তা ভালোভাবে প্রচার করা দরকার। আর যদি না থাকে তাহলে লিখিত আকারে কিছু নিয়ম থাকা জরুরী।

যাই হোক, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার মোজাভে ডেসার্ট থেকে নাম এন্ট্রি করে ট্রেকিং শুরু করে স্ট্রেইড।

যারা সাজেক বা বগা লেক হয়ে কেওক্রাডং পর্যন্ত গিয়েছেন তাদের মনে পড়বে জায়গায় জায়গায় চান্দের গাড়ি থেকে নেমে নাম এন্ট্রি করতে। তবে আমাদের এখানে পাহাড় অশান্ত থাকার কারনে সিকিউরিটি নিশ্চিত করার জন্য নাম এন্ট্রি করতে হয়। সেনাবাহিনী বা বিজেবি এই কাজে সহযোগিতা করছে ভ্রমণ প্রেমীদেরকে।

কিন্তু সেখানে গাছের সাথে বা কোন খুটির সাথে একটি বক্সের মধ্যে কলম এবং রেজিস্টার থাকে। যাওয়ার সময় নিজ দায়িত্বে নাম এন্ট্রি করে যান ট্রেকাররা।

যাওয়ার আগের দিন দেখা যায় প্রায় তার সমান এক ব্যাকপ্যাক কাধে নেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। শেষ পর্যন্ত শুয়ে কাধে নিতে সফল হন।

সেই ব্যাকপ্যাকের ওজন কত পাউন্ড ছিলো তা জানা যায়নি মুভিটি থেকে। কিন্তু পরে মুভি রিলিজের পর রিজ উইদারস্পুন বলেন, ওয়াইল্ড মুভি তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন একটি কাজ। তিনি বলেন, এটা ঠিক আমি হয়তো এক হাজার মাইল ট্রেকিং করিনি।

কিন্তু প্রথমে আমি ৪৫ পাউন্ড ব্যাকপ্যাক নিয়ে ট্রেকিং করেছি। পরে কেউ কেউ বললেন, এটা তেমন ভারি দেখাচ্ছেনা। পরে এটা বাড়িয়ে ৬৫ পাউন্ড করেছি। এবং এই বিশাল ওজনের প্যাক নিয়ে আমি নয়-দশ বার পাহাড়ে উঠা-নামা করেছি।

ট্রেকিং এর কয়েকদিন পরে একটি ক্যাম্পে দেখা হয় এড এর সঙ্গে। যেটা তার দরকার নেই বা অপ্রয়োজনীয় সেটা ফেলে দিয়ে তার প্যাক অনেকটা হালকা করে দেয় এড। তাকে আরেকটি বিষয়ে সাহায্য করে এড।

সেটা হলো তার বোট সাইজে ছোট ছিলো এবং তাকে বুদ্ধি দেয় বোট বদলিয়ে নেয়ার জন্য সামনে যেখানে সে বিরতি নিবে সেখান থেকে।

ট্রেকিং এর ফাকে ফাকে ফ্ল্যাশব্যাকে চলতে থাকে তার অতীত কাহিনী।

জানা যায় তার মা ছিলো খুবই প্রিয়। তার মা ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এর পর থেকে সে প্রচন্ড ভেঙে পড়ে। তার স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। সে হেরোইন আসক্ত হয়ে পরে। এবং বেপরোয়া সেক্স লাইফে জড়িয়ে পড়ে।

এক সময়ে সে প্র্যাগন্যান্ট হয়ে পড়ে কিন্তু সে এতোজনের সাথে সেক্স করেছে যে যাদেরকে সে হয়তো কখনো দেখেইনি বা যাদের সাথে হয়তো আর কখনো দেখা হওয়ার সম্ভাবনাই নেই। তাই কখন যে সে প্রাগন্যান্ট হয়ে পড়েছে তা সে জানেই না।

পরে সে অ্যাবর্শন করে এবং সিদ্ধান্ত নেয় ট্রেকিং করার।

পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিলো না এবং একটা মেয়ে একা একা ট্রেকিং করছে এমন একটা ভয়াণক পথে বিপদতো হবেই। প্রথম দিন সে পাচ মাইল ট্রেকিং করেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাবু খাটিয়ে যখন রান্না করতে যাবে তখন বুঝতে পারে ভুল গ্যাস নিয়ে এসেছে তাই আগুন ধরাতে না পেরে ভালো মতো আর খাওয়া হয়নি।

৫৮-তম দিনে তার পানি শেষ হয়ে যায়। পরে গর্ত থেকে অপরিস্কার পানি নিয়ে বিশুদ্ধ করার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। এমন সময় দুই পুরুষ শিকারির সাথে দেখা হয়। তাদের মধ্য থেকে একজন ফিরে এসে ভয় দেখায়। এবং সাথে সাথে সে সেখান থেকে চলে আসে।

বৈরি আবহাওয়ার মধ্যে যেমন পড়ে আবার তেমনি রাস্তায় চলার সময় বিশাল অজগর সাপ দেখে ভয়ে কুকড়েও উঠে।

তবে খারাপ বা ভয়াণক অভিজ্ঞতার সংখ্যা কমই ছিলো। ভালো লাগার সংখ্যাই ছিল বেশি। নিজেকে চেনা, বুঝা, সংশোধন করে নেয়া এবং নিজের ভেতরের হিংস্রতাকে দূর করার পথই খুজে পেয়েছেন স্ট্রেইড তার এই দীর্ঘ ট্রেকিং থেকে।

খেতে না পেয়ে এক কৃষকের বাড়িতে আতিথেয়তা এবং সেখানে শাওয়ার নেয়া, অন্য ট্রেকারদের সাথে ভালো সময় কাটানোসহ অসংখ্য ভালো বিষয়ের মুখোমুখি হয় স্ট্রেইড।

যারা কেওক্রাডং ট্রেকিং-এ গিয়েছেন তারা জানেন, আসা-যাওয়ার মধ্যে বিভিন্ন দলের সাথে দেখা হয়। এই সময় সবাই একজন আরেকজনের সাথে কথা না বললেও হাসি মুখে আরেকজনের দিকে তাকান।

যেহেতু একই জায়গায় সবাই থাকেন তাই ঘুরে ফিরে সবার সাথে বার বার দেখা হয়। ট্রেকিং করে সন্ধ্যার দিকে সবাই যখন বগা লেক ফিরতে থাকেন তখন প্রতিটা দলকে সবাই কংগ্রাচুলেট করেন। সবার মধ্যে ভাত্তৃত্ববোধ কাজ করে।

মনে হয় কতো আপন।  এভাবেই খারাপ দিকগুলো মন থেকে দূর হয়ে যায়। ভ্রমণ শেষে শরীর রিফ্রেশ হওয়ার সাথে সাথে মনও রিফ্রেশ হয়ে যায়।

এর পর স্ট্রেইড -এর দেখা হয় একটি ছোট ছেলের সাথে যে তার দাদির সাথে ট্রেকিং করছিলো। ছেলেটি তার মার কথা জানতে চায়। তার মা মারা গেছেন এটা জানার পর ছেলেটি ‘রেড রিভার ভ্যালি’ গান গেয়ে শোনায়।

গান গেয়ে ছেলেটি চলে যাওয়ার পর সে কান্নায় ভেঙে পরে। আসলে ভালোবাসা, মমতা, সহযোগিতা কতোভাবেইনা মানুষের কাছে আসতে পারে!

মুভিটিতে কিছু কথা আছে যেগুলো অনেককেরই হয়তো ভালো লাগবে। স্ট্রেইড -এর মা ববি বলেন, আমি জীবনের পুরাটা সময়জুড়ে কারো মেয়ে, কারো মা আবার কারো স্ত্রী ছিলাম। কিন্তু কখনো নিজের জীবনের চালক ছিলাম না।

আবার ট্রেকিং এর এক পর্যায়ে সে একটি শো-রুমে ঢুকে ঠোটে লিপস্টিক লাগায়। তখন সেলসগার্ল এসে তাকে বলে, খুব সুন্দর লিপস্টিক একটা মেয়েকে অপ্সরী করে তুলতে পারেনা, যদি না সে নিজেকে বিশুদ্ধ রাখতে পারে।

৯৪ দিন পরে সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখে তার ট্রেকিং শেষ হয় অরেজন এবং ওয়াশিংটন এর মধ্যে যে কলাম্বিয়া নদী আছে তার উপর ‘ব্রিজ অফ দি গডস’-এ এসে।

ট্রেকিং এর সময় কয়েকবার একটি লাল শেয়াল সে দেখতে পায়। পরে সে বলেছে, শেয়ালটা তার মা হয়ে সবসময় তার পাশে থেকেছে অনুপ্রেরণা হিসেবে। তাকে সাহস যুগিয়েছে।

ভ্রমণ সবাইকে আনন্দ দেয়, রিফ্রেশ করে। মানুষকে চেনা যায়, প্রকৃতির কাছ থেকে অনেক কিছু শেখা যায়। এই চেনা-জানা থেকে এমন কিছু শেখা যায় যা একজন মানুষকে আমূল বদলে দিতে পারে।

তেমনি প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া একটা জীবন থেকে নতুন করে বাচার আশা খুজে পায় স্ট্রেইড। গড অফ ব্রিজে আসার পর সে নিজে নিজে বলতে থাকে, চার বছর পর সে পুনরায় আবার বিয়ে করবে। পাচ বছর পর তার একটা ছেলে হবে এবং এর এক বছর পর একটা মেয়ে হবে। এবং তার নাম হবে ববি যেটা তার মায়ের নাম।

You Might Also Like

No Comments

Leave a Reply

shares