Travel

কলকাতাঃ এক চেনা শহর

February 18, 2017
কলকাতা

প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে।

টেক্সি ছুটে চলেছে কলকাতা শহরের দিকে।

জানালা বন্ধ।

অনেক কষ্ট করে একটা নন-এসি টেক্সি ভাড়া করতে পেরেছি। যাবো ক্যামেক স্ট্রিট। ভাড়া ছয়শত বিরাশি রুপি।

বৃষ্টির মধ্যে বাইরে ঘুরতে ভালো লাগে। তবে এসি গাড়ি হলে খুব ভালো হতো। বৃষ্টি হওয়াতে বাহিরে ঠান্ডা হলেও ভিতরে ঘোমট গন্ধ। তাই একটু অসস্তি লাগছে।

দেশের বাইরে এসে ভালোই লাগছে। আমাদের সাথে তাদের কি পার্থক্য, তারা কোন কোন দিকে ভালো করেছে আমাদের চেয়ে তা নিজ চোখে দেখতে পারবো। তাদের ভালো ভালো কাজগুলো দেখে শিখতে পারবো। এটা ভেবে ভালো লাগছে।

যারা আগে কলকাতা এসেছেন তাদের কাছে শুনেছি। আবার বিভিন্ন সময়ে টিভিতে, মুভিতে কলকাতা শহর দেখেছি। কিন্তু এখন তো তা নিজের চোখে দেখতে পারবো। তাই ভেবে ভিতরে ভিতরে কিছুটা উত্তেজনা অনুভব করছি।

মনে মনে যখন এইগুলো ভাবছি তখন রাস্তার উল্টোদিকে চোখ পরতেই দেখি লম্বা ট্রাফিক জ্যাম। একটু যেতেই আমার টেক্সিও জ্যামের মধ্যে পরে গেল। আমি ভেবেছি হয়তো ট্রাফিক সিগন্যালে আছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেড়ে দিবে। কিন্তু না, আমাদের টেক্সি একই জায়গায় বসে আছে।

ড্রাইভারকে এর কারন জানতে চাইলাম। তিনি তার স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দিলেন, দাদা সবে তো শুরু। এখনও কলকাতাতে পৌছেননি। তখন মজা বুঝবেন।

দাদা বুঝি এই প্রথম এখানে আসলেন? আমার কাছে জানতে চাইলেন।

আমি হ্যা বললাম।

তিনি বললেন, এসেছন যখন তখন সবই দেখতে পারবেন।

আমি একটু চিন্তায় পরে গেলাম।

ড্রাইভার বললেন, দাদা এখন যা জ্যাম আমরা যদি বাইপাস দিয়ে শহরে ঢুকি তাহলে একটু আগে যেতে পারবো।

কতক্ষণ আগে? জানতে চাইলাম।

আধা ঘন্টা আগে। কিন্তু আপনাকে পঞ্চাশ রুপি বেশি দিতে হবে।

রাজি হয়ে গেলাম। এমনিতে ফ্লাইট ডিলে করাতে দেরি হয়ে গেছে। এখন যদি আবার জ্যামে বসে থাকি তাহলে আজকে আর কাজই হবে না। আর আজকে কাজ করতে না পারলে, আগামীকাল ঘুরার প্লান কেনসেল হয়ে যাবে। তাই রাজি হয়ে গেলাম।

বৃষ্টি এখনো অভিরাম হয়েই চলেছে। মধ্যে দিয়ে আইল্যান্ড। রাস্তার ওপাশে থেমে থেমে গাড়ি চলছে। আমাদের অবস্থাও ঠিক একই রকম।

রাস্তার দুই পাশে কিছু দূরে দূরে বিভিন্ন ধরনের গাছ দেখতে পাচ্ছি। বৃষ্টিতে গাছের পাতায় জমে থাকা ধুলা-বালি পরিষ্কার হয়ে এখন কি সবুজ দেখাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে কেবলই যেন পাতা গজেছে। নিষ্পাপ মনে হচ্ছে। আকাশে জমে থাকা কালো মেঘ বৃষ্টি হয়ে গাছের পাতা পরিস্কার করে দিচ্ছে। সাথে সাথে ঘন-কালো আকাশটাও সাদা হতে শুরু করেছে।

মানুষের মনটাও যদি এভাবে ধুয়েমুছে সব নুংরামি, পাপ, খারাপ চিন্তা পরস্কার হয়ে যেতো। আবার নতুন করে, ভালো মানুষ হয়ে, পবিত্র হয়ে, নতুন জীবন নিয়ে কাজ শুরু করতো।

এই আফসোস নিয়ে বাইরে আবার তাকালাম।

কিছু গাছের ঢাল ভেঙ্গে উপর হয়ে আছে। আবার কিছু কিছু জায়গায় ঢাল ভেঙে বৈদ্যুতিক তারের উপর ঝুলে রয়েছে। আইল্যান্ডের যে ল্যাম্প-পোস্ট দাড়িয়ে আছে তার গায়ে মমতা ব্যানার্জির ছবি, স্লোগান দিয়ে ব্যানার চোখে পরছে।

আস্তে আস্তে কেমন যেন মিল পাচ্ছি। চেনা চেনা মনে হচ্ছে।

মনে হচ্ছে একি আমি কি এখনও ঢাকাতেই আছি।

সাথে সাথেই মনে হলো রাজনৈতিক কর্মকান্ড এখানে তো থাকবেই। সেই বৃটিশ আমল থেকেই এখানে রাজনীতি তুমুল আকার ধারন করেছিলো। কিন্তু বৃটিশরা চলে গেলেও সেই একই ধরনের রাজনীতি এখন থেকে যায়নি।

কিন্তু এই রাজনীতির মধ্যে দিয়ে দেশের কতটুকু কল্যাণ হয়েছে তা চিন্তার বিষয়। কারন মাত্র এসেছি। কয়েক মিনিটেই মন্তব্য করার জায়গায় যেতে পারিনি।

জ্যাম ঠেলে ক্যামেক স্ট্রিটে চলে এসেছি। বাজে সাড়ে বারোটা। ফ্রেশ হয়েই মিটিং রুমে ঢুকে পরি। আগামি এক মাস কি করতে হবে, কিভাবে করতে হবে এই প্ল্যান চলছে। মধ্যে লাঞ্চ ব্রেক দিয়ে টানা মিটিং চললো সন্ধ্যা সাড়ে আটটা পর্যন্ত।

সেখান থেকে বেরিয়ে পাশেই হোটেল-এ চলে এসেছি। বিশ মিনিটেই চলে এসেছি রেড অ্যারো রেসিডেন্সি তে। চার তলায় ডাবল বেডের রুম। ভাড়া আড়াই হাজার টাকা। সাথে ব্রেকফাস্ট। ভ্যাটসহ ২৮৫০ রুপি পরবে।

ঢাকাতে এইমানের রুম দুই হাজার টাকায় পাওয়া যাবে। যাই হোক, ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পরি রাতের কলকাতা শহর দেখার জন্য। রাতের খাবারও খেতে হবে।

একটা প্ল্যান ছিলো রাতে যেহেতু ঘুরতে পারবো না তাই কোন একটা সিনিপ্লেক্সে গিয়ে মুভি দেখবো।

আমি যাওয়ার কয়েকদিন আগেই সুলতান মুভি রিলিজ হয়েছে। ভেবেছি কাছেই ভালো একটা জায়গায় মুভিটা দেখে নিবো।

ইন্ডিয়া এতো বড় হয়েও এবং অনেক সমস্যা নিয়েও কিভাবে তারা এখনও একসাথে টিকে আছে তার পিছনে যে কয়টা কারন আছে তার মধ্যে একটি হলো মুভি আর অপরটি হলো ক্রিকেট।

আর ইন্ডিয়াতে সবাই মিলে থিয়েটারে গিয়ে মুভি দেখার প্রচলন আছে। তাই আমিও ঠিক করেছিলাম মুভি দেখবো। কিন্তু হোটেলে খুজ নিয়ে জানলাম আজ রাতে এখন আর কোন শো ধরতে পারবো না।

আগামীকাল সকাল নয়টা দশ মিনিটে কাছেই ফোরাম শপিং মলে থিয়েটার আছে। সেখানে সুলতান মুভি দেখাতে পারবো।

সাড়ে নয়টা বাজে। বেরিয়ে রাস্তা দিয়ে হাটছি।

ভাবলাম কিছুক্ষণ হেটে নেই তারপর টেক্সিতে করে ফোরাম চলে যাবো। ফোরাম যেহেতু কাছে তাহলে সেখানেই আপাতত ঘুরে আসি।

হাটতে গিয়ে দেখি রাস্তায় পাথর অর্ধেক ভেসে আছে। এবং এই পাথর সমান্তরালভাবে বিছানো। তারমানে এইগুলো কোন একটা কারনে করা হয়েছে।

এখনো জ্যাম পুরাপুরি কমেনি। গাড়ি হর্ন বাজাচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি চোখে পরছে টেক্সি। বিভিন্ন রঙের বাসও কিছুক্ষণ পরপর আসছে। তবে তাদের বাস দেখতে আমাদের মত না। মিনিবাস একদম বলতে গেলে নাই। এখন পর্যন্ত দেখিনি। তাদের বাসগুলি আমাদের এখানে আগে যেমন মুড়িরটিন বলতাম সেরকম অনেকটা। বেশ লম্বা।

ফুটপাত দিয়ে হাটছি। কোথাও উচু, কোথাও নিচু। আবার মাঝে মাঝে ভাঙ্গাও। তেমন প্রশস্ত না। ফুটপাতের উপর, রাস্তায় ড্রেনের পাশে ময়লা জমে আছে। বৃষ্টি হওয়াতে ড্রেনের ময়লা উপরে উঠে এসেছে। কাদাও জমে আছে। তাই দেখে দেখে হাটতে হচ্ছে।

আমাদের এখানে ফুটপাত, রাস্তা যেমন ঠিক তেমনই। বিল্ডিং এর ওয়ালে কোথাও পোস্টার ছিড়ে ঝুলে আছে, আবার কোন পোস্টারের উপর কাদা ছিটানো।

মোবাইল সিম এখনও চালু করতে পারিনি। সাথে নিয়ে এসেছিলাম। মেয়াদ আছে কিন্তু টাকা লোড করতে হবে। এতোক্ষণ ধরে হাটছি কিন্তু কোন ফ্লেক্সিলোডের দোকন দেখতে পেলাম না। হাটতে থাকলাম।

আধাঘন্টা হয়ে গেল। পেলাম না।

ক্ষুধা লাগছে। খেতে হবে। আসার আগে অনেক শুনেছিলাম কলকাতাতে খুব কমে খাওয়া যায়। ফুটপাতে চল্লিশ- পঞ্চাশ রুপির মধ্যেই হয়ে যায়।

আমাদের মত এখানেও ফুটপাতে খাবারের দোকান আছে। কিন্তু যা দেখেছি তা বাংলাদেশের মতই। আলাদা কিছু না। ফুটপাতে এই টাকা দিয়ে যদি খাই তাহলে সাথে সাথে বাথরুমে দৌড়াতে হবে। তাই তাদের সেই পরামর্শ গ্রহণ করা গেলো না।

অনেকক্ষণ হেটেছি।

ভাবলাম ফোরামে চলে যাই। সেখানে গেলে নিশ্চয়ই পাবো। টেক্সি পেয়ে গেলাম।

সর্বনিন্ম ভাড়া পচিশ রুপি। গাড়ি তেলে চলে। আমাদের এখানে সিএনজি। সে তুলনায় এখানে খরচ অনেক কম।

অথচ আমাদের এখানে সিএনজি অটোরিকশায় উঠলে সর্বনিন্ম ভাড়া চল্লিশ টাকা।

কিছুক্ষণ পরেই নামিয়ে দিলো। ০.৬ কিমি। পচিশ রুপি অতিক্রম করেনি। পচিশ রুপি দিয়ে নেমে গেলাম।

তাদের এখানে একটা বাহন চোখে পরছে না। রিকশা। তাই হয়তো বাসে বা ট্রামে বা টেক্সিতে করে যেতে হবে। আর এর কোনটা না পেলে পা তো আছেই।

ফোরাম শপিং মল ততটা বড় না। পাচ-ছয়তলা হবে। সামনে একটু খোলা জায়গা।

হেটে ভিতরে ঢুকলাম। সেখানেও কোন ফ্লেক্সিলোডের দোকান পাইনি।

ফোরাম থেকে বেরিয়ে একটু বয়স্ক পথচারীকে বললাম, মোবাইলে টাকা রিচার্জ করবো। কোথায় করতে পারবো?

আগে যাও।

বুঝলাম না, এ কথা বলাতে তিনি একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, কোথথেকে এসেছো? বাংলাইতো বলেছি। তাহলে বুঝতে পারো নি কেন?

না মানে ‘আগে’ বুঝলাম না।

তখন তিনি হাত দিয়ে ইশারা করে সামনের দিকে যেতে বললেন।

বুঝলাম তারা সামনে কে আগে বলে।

তার কথা মত আগে হাটা শুরু করলাম। কিন্তু পেলাম না।

তারপরে একটা ইয়াং ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম।

তিনি বললেন, এই রাস্তায় হেটে একটু আগে গেলেই চায়ের দোকান পরবে। সেখানে রিচার্জ করতে পারবেন। খুব ভালোভাবে বলে দিলেন।

ফোরামে গিয়ে কিছু শো রুমে ঘুরা ঘুরি করলাম। সব দোকানেই দেখলাম, ৪০%, ৫০% পর্যন্ত ডিসকাউন্ট চলছে। একটা দোকানের সেলসম্যান কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এখন তাদের ডিসকাউন্ট সিজন চলছে।

সেখান থেকে বেরিয়ে খাওয়ার জন্য বের হলাম।

হাটতে হাটতে একটু মোটামোটি মানের রেস্টুরেন্ট পেয়ে গেলাম। তখন বাজে রাত পৌনে এগারোটা। রেস্টুরেন্ট পুরা ফাকা। বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শুধু দোসা আছে।

ভাবলাম এতো রাত হয়ে গেছে। এদিকে প্রচন্ড ক্ষুধাও লেগেছে। আর ঘুরাঘুরি না করে যা পেয়েছি আপাতত খেয়ে নেই। কাল দেখা যাবে।

দোসার সাথে আলুর তরকারি সাথে চাটনি। দাম কমই। কিন্তু মুখে দিয়ে তেমন ভালো লাগলো না। মনে হচ্ছে শেষ করতে পারবো না। সাথে একটা কোক নিলাম। এমন চিকন পাইপ দিয়েছে আমার কাছে মনে হচ্ছে একঘন্টা খেলেও শেষ করতে পারবো না। শেষে কোক এবং দোসা কিছুটা রয়ে গেছে।

সেখান থেকে বেরিয়ে হোটেলে এসে শুয়ে পরেছি। আমার সাধারনত নতুন জায়গায় গেলে রাতে ঘুম হয় না। অ্যাডজাস্ট করতে দুই তিনদিন লেগে যায়। তাই আজ যে কম ঘুম হবে তা জানি। হোটেল বয় কে জানিয়ে রেখেছি আমি সকাল সাড়ে ছয়টায় বেরিয়ে পরবো। আমাকে যেন সেইভাবেই ব্রেকফাস্ট দেয়।

বৃষ্টির শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে জানালার পর্দা সরিয়ে দেখি বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে।

মনটা খারাপ হয়ে গেল। ঘুরাঘুরির প্ল্যান মাটি হয়ে গেল।

সিদ্ধান্ত নিলাম যেহেতু বৃষ্টির মধ্যে বাহিরে ঘুরতে পারবো না তাই মুভি দেখাটাই ভালো হবে।

আস্তে ধিরে রেডি হয়ে  গোসল সেরে ব্রেকফাস্ট করতে গেলাম। ব্রেকফাস্ট খুব ভালো লেগেছে। পাউরুটি, ডাবল ডিম বাজি, এক গ্লাস আমের জুস আর ছোট এক বাটি পেপে। তৃপ্তিসহকারে খেয়ে বেরিয়ে পরলাম।

১২টার মধ্যে আমাকে চেক আউট করতে হবে।

আমি তাদেরকে বললাম ব্যাগ গুছিয়ে রেখে যাবো। চারটার এসে গোসল করে নিয়ে যাবো।

বাইরে ঘুরাঘুরি করে ঘেমে যাবো। এই অবস্থায় যেতে পারবো না। অসস্তি লাগবে।

তারা রাজি হলেন। ব্যাগ গুছিয়ে তাদের কাছে রেখে ফোরামের উদ্দেশ্যে রৌণা হলাম।

বৃষ্টি পরছে।

একটু দাড়িয়ে থেকে টেক্সি পেয়ে গেলাম। মিটারে যেতে রাজি হলেন না। সত্তুর রুপি চাইলেন। এর কম হলে যেতে পারবেন না। বৃষ্টির মধ্যে না ভিজে উঠে পরলাম। ফোরামে সাড়ে আটটায় পৌছে গেলাম।

সিনেপ্লেক্স লিফটের পাচ-এ। টিকেটের দাম মাত্র ১৩০ রুপি। অবাক হলাম এতো কম প্রাইস শুনে।

বাথরুমে ফ্রেশ হওয়ার জন্য গেলাম। পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন। আরেকটি জিনিসের দিকে চোখ পরলো। সারি সারি কমডের পাশে নিচু একটি কমড। যখন তাকিয়ে দেখছি তখন একটা ছোট বাচ্চাকে সেখানে গিয়ে তার কাজ সারতে দেখলাম। খুব ভালো লাগলো।

আমাদের দেশে এটা কোথাও দেখা যায়না।

আর এখানকার বাথরুম খুবই পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন।

আমাদের দেশে শুধু বসুন্ধরা শপিং মলেই সারাক্ষণ পরিষ্কার করতে দেখা যায়। এ ছাড়া আর কোথাও এমনটা দেখা যায় না।

নয়টার সময় হলে ঢুকে পরি। অনেক বড়। সিট সামনে পিছে মুভ করে। আরামদায়ক।

এখন অ্যাড চলছে। পুরু হল ফাকা।

শুনে এসেছি এখানে সবাই দলবেধে মুভি দেখতে আসে অথচ হল পুরা ফাকা। আমি গুনে দেখলাম আমিসহ এগারো জন। এই কয়েকজনকে দিয়ে মুভি শুরু হয়ে গেল। সাউন্ড কোয়ালিটি খুবই ভালো।

আমরা বসুন্ধরা বা যমুনা ফিউচার পার্কে মুভি দেখতে গেলে আমাদের টিকেটের সর্বনিন্ম ২৫০ টাকা লাগে। বসুন্ধরার সিট, সাউন্ড কোয়ালিটি সবকিছু থেকে এখানে ভালো। অথচ এখানে মুভি দেখার খরচ কম।

বিরতির সময়ে বেরিয়ে একটা পপকর্ন আর মিরিন্ডা নিলাম। দুইটা মিলিয়ে দাম পরলো ৩৯০ রুপি। মোট খরচ হলো ৫২০ রুপি।

আমরা শুনে এসেছি কলকাতার মনুষরা খরচ করতে চায়না। কিন্তু এটা মানা গেলো না। তারা মুভি দেখতে এসে খরচ করছে। আমি যেই খরচ করেছি এর চেয়ে কম কেউ করতে পারবে না। তবে কেউ যদি শুধু ১৩০ রুপিতে মুভি দেখে চলে যায় সেটা ভিন্ন।

আমি বাদে বাকি দশজনের কাউকে কিছু না কিছু কিনতে দেখেছি। তার মানে তারা খরচ করে। মুভি দেখে বের হয়েছি সাড়ে বারোটায়। সিম্পল গল্প হলেও একটু ভিন্ন। ভালো লেগেছে। সালমান খানের মারদাঙ্গা মুভির মত না।

বাইরে বেরিয়ে দেখি বৃষ্টি নেই। রোদ উঠেছে। হাতে সময় আছে সর্বোচ্চ দুই ঘন্টা। হোটেলে পৌছে গোসল করে চারটার মধ্যে ক্যামেক স্ট্রিটে যেতে হবে। সেখান থেকে বসের সাথে এয়ারপোর্ট যেতে হবে। তাই ঠিক করলাম প্রথমে নিউ মার্কেট যাই। তারপর সময় পেলে ভিকটোরিয়া পেলেস দেখতে যাবো।

কোন টেক্সিই মিটারে যেতে রাজি হচ্ছে না।

পরে দেড়শো রুপিতে রাজি হয়ে একটা টেক্সিতে উঠি। ড্রাইভারকে বললাম, মিটার অন করে রাখার জন্য। আমি জানতে চাই কত উঠে।

নিউ মার্কেটে যেতে মিটারে উঠেছে ৭৬ রুপি।

আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। মাথাটা ঠান্ডা রেখে তাকে ভাড়া দিয়ে শুধু বললাম, তুমি অন্যায় করেছো। আমার দেশের কোন সিনজি বা টেক্সি চালক হলে লজ্জা পেতো। তোমার মধ্যে আমি তা দেখতে পাচ্ছি না। বলে নেমে গেলাম।

আমাদের ঢাকা নিউ মার্কেটের আশেপাশে যেমন ভিড় থাকে, ফুটপাতে খোলা আকাশের নিচে প্লাস্টিক বা পলিথিনের ছাউনির নিচে জামা-কাপড় বা অন্যান্য জিনিস নিয়ে বসে থাকে ঠিক তেমনই এখানেও দেখতে পেলাম।

ভেতরে ঢুকলাম। তেমন ভিড় নেই। একটা বিল্ডিং। আমাদের নিউ মার্কেটের মত না। আমাদের নিউ মার্কেট খুবই খোলামেলা, রাউন্ড শেপ। ভালো লাগে। বেশিক্ষণ না থেকে বেরিয়ে আসি।

হাতে সময় আছে দেড় ঘন্টা।

এবার চিন্তা করলাম ভিক্টোরিয়া পেলেস, সাউথ সিটি মল ঘুরে হোটেলে চলে যাবো। এই সময়ের জন্য টেক্সি রিজার্ব করতে চাইলাম। ছয়শত টাকা চাইলেন। পরে পাচশত রুপিতে রাজি হলো।

ভিকটোরিয়ার সামনে নেমে কিছুক্ষণ থেকে আবার ছুটলাম সাউথ সিটি মলে। সেখানে শুধু নেমে একটু দেখে আবার উঠে গেলাম।

তখন ড্রাইভার বললেন, তুমি ভিতরে গিয়ে একটু দেখে আসবে না। এতো ভালো একটি শপিং মল। তোমার দেশে এমন শপিং মল আছে?

সাথে সাথে কথটা খুব লাগলো। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। বললাম, তোমাদের এমন চার-পাচটা শপিং মল-এর সমান আমাদের একটাই হবে।

তখন সে বললো, বলো কি? এতো বড় শপিং মলও তোমার দেশে আছে?

আমি বললাম একটা না কয়েকটা আছে।

জ্যাম সারা রাস্তায়ই ছিলো। সেই জ্যাম ঠেলে তিনটার আগেই হোটেলে পৌছে যাই।

টেক্সি ভাড়া দিয়ে দেখি আমার কাছে মাত্র দুইশত পনের রুপি আছে। লাঞ্চ করিনি। আবার টেক্সি দিয়ে অফিসে যেতে হবে।

সাথে দুইশ ডলার আছে। কিন্তু এক্সচেইঞ্জ করতে পারিনি। নিউ মার্কেটে এক্সচেইঞ্জ হাউজ খুজেছিলাম কিন্তু পাইনি। চিন্তা করলাম এখন যদি আমি মানি এক্সচেইঞ্জ এর জন্য সময় ব্যয় করি তাহলে আমার ঘুরা হবে না। তাই আর করিনি।

কিন্তু এখন টাকা রেখেও টানাটানির মধ্যে আছি। আমার যে কয়েকটা সমস্যার মধ্যে প্রতিনিয়ত থাকি তার মধ্যে একটি হলো হঠাৎ করে পকেটে টাকা থাকে না। এমনটা প্রায়ই হয়ে থাকে। কিন্তু এর থেকে বেরুতে পারছি না।

ছোটমত একটি ফাস্টফুডের দোকানে ঢুকলাম। একটা আপু এসে জানতে চাইলেন কি খাবো। তিনি আমার কথা শুনে হয়তো বুঝতে পেরেছেন আমি ইন্ডিয়ান না।

তখন আমি কোথথেকে এসেছি তা জানতে চাইলেন।

বললাম, বাংলাদেশ থেকে।

তখন তিনি বললেন, তাহলে আমি আপনাকে আমাদের কিছু খাবার সাজেস্ট করি আশাকরি আপনার ভালো লাগবে।

মেনে নিলাম।

প্রথমে দিলেন, দোকলা। এটা খুবই হালকা, ভেশন দিয়ে তৈরি করা হয়। আমাদের এখানে রাস্তার যেমন বাপা পিটা বিক্রি করে তেমন সাইজ। একটু টকটক, লবণাক্ত। আন-কমন টেস্ট।

তারপর দিলেন, বরাপাউ। এটা হলো বার্গারের মত। রুটির ভেতরে মাংসের চপ না থেকে আলুর চপ। এটা খেয়েই পেট একদম ভরে গেলো।

আমি যখন খাচ্চিলাম তখন দোকানের সবাই আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলেন। অসস্তি লাগছিলো।

স্কুল ছুটি হয়েছে। ছেলে মেয়েরাও খেতে ঢুকছে।

দেখলাম তাদের মধ্যে প্রায় সবাই বরাপাউ খাচ্ছে। দাম মাত্র পচিশ রুপি। এটা ভালোই। মাত্র পচিশ টাকা দিয়ে পেট ভরে যায়।

আরেকটা মিস্টি খেতে বলেলেন। আমার মিস্টি ভালো লাগে। তাদের মিস্টি টেস্ট করার ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু আর পারবো না। পয়তাল্লিশ টাকায় দুপরের খাবার শেষ।

খাওয়া শেষ করে হোটেলে এসে গোসল করি।  হোটেল বয়কে পঞ্চাশ রুপি টপস দিয়ে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পরি।

টেক্সি এবারও মিটারে যাবে না। একশত রুপি লাগবে। দেরি না করে উঠে পরি। চারটার মধ্যেই পৌছে যাই ক্যামেক স্ট্রিটে। ভাড়া দিয়ে দেখি আমার কাছে মাত্র বিশ রুপি আছে।

নিশ্চিন্ত হলাম। এখন আর টেনশন নেই। বসের সাথে আছি। তার সাথে গাড়িতে করে এয়ারপোর্টে যাব। আমার আর খরচ করতে হবে না।

টেক্সি থেকে নেমে বসকে ফোন দিলাম। তিনি আমাকে নিচেই অপেক্ষে করতে বললেন।

পাচ মিনিটের মধ্যে তিনি নিচে নেমে আসলেন।

সাথে সাথে গাড়িতে উঠে আমরা এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রৌণা হলাম।

যত যাচ্ছি কলকাতা শহর ততই পিছনে পরে যাচ্ছে।

গুডবাই কলকাতা।

You Might Also Like

No Comments

Leave a Reply

shares