Travel

জেন্টলম্যান দেশে-বিদেশেঃ যায়যায়দিন টু স্যাটারডে ক্লাব

January 19, 2017
দেশে বিদেশে

তখন যায়যায়দিন-এ কন্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করি।

একদিন বিকেলে যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স-এ গিয়ে চা খাওয়ার জন্য চে ক্যাফেতে ঢুকতে গিয়ে দেখি শফিক রেহমানের সাথে বিদেশি এক ভদ্রলোক। স্যার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স।

দেখানোর এক পর্যায়ে স্যার তাকে নিয়ে চে ক্যাফের পাশেই কিচেন রুমের সাথে বাথরুমের দিকে নিয়ে গেলেন। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। স্যারের রুমে তো বাথরুম আছে সেটা রেখে এখানে কমন বাথরুমে কেন নিয়ে যাচ্ছেন?

একটু পরেই তারা বেড়িয়ে এলেন। তারপর স্যার তাকে বাথরুম কতটা গুরুত্বপূর্ণ, বিভিন্ন দেশের বাথরুম কেমন এবং যখন তিনি এই মিডিয়াপ্লেক্স করেন তখন তিনি কেন বাথরুমের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন তা বললেন।

তাকিয়ে দেখলাম, ভদ্রলোক স্যারের সাথে হাসি মুখে একমত হলেন। পরে জানতে পেরেছি ভাদ্রলোক ছিলেন কোরিয়ান টাইকোন। চিটাগাং-এ যে কেইপিজেড হচ্ছে সেটা তিনিই করছেন।

বাংলাদেশে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, সরকারি অফিস-আদালত, ফিলিং স্টেশন, বাস-রেল স্টেশন, রেস্টুরেন্ট, শপিং সেন্টারসহ বিভিন্ন জায়গায় বাথরুমের অবস্থা কি তা আমরা সবাই জানি। শব্দটা মাথায় আসার সাথে সাথেই নোংরা, দুর্গন্ধ, মাছি ভণ ভণ করার দৃশ্য চোখের সামনে ভাসতে থাকে।

তবে বাইরের মুভিগুলোতে দেখেছি বাথরুমে হাই কমডে বসে তার প্রাকৃতিক কাজ সাড়ার পাশাপাশিবই পড়তে।

গত বছর জুলাই মাসে দুই দিনের জন্য কলকাতা গিয়েছিলাম।

আমি পানি অনেক বেশি খাই। তাই আমাকে ঘন ঘন বাথরুমে যেতে হয়। এ কারনে বাথরুম দেখার অভিজ্ঞতা আমার একটু বেশি।

এমনও হয়েছে, বাসে কোথাও যাচ্ছি। পথে জ্যাম থাকাতে বাস থেমে আছে। সেই সুযোগে বাসের গাইডকে বলে নামতাম।

কিন্তু একটু ভালো জায়গা খুজতে গিয়ে দেরি হয়ে যেতো। এদিকে জ্যাম ছেড়ে দিলে বাস আমার জন্য অপেক্ষা করতো। সে সময় বাসে উঠতে গেলে সবাই যেভাবে বিরক্তভাব নিয়ে তাকিয়ে থাকতো তা দেখার মতো।

যাই হোক, গত জুলাই মাসে কলকাতা এয়ারপোর্টে নেমে বাথরুমে গেলাম। বাথরুমে ঢুকে অবাক হয়ে যাই মূলত পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা দেখে। সাথে অত্যাধুনিক ফিটিংস। সেন্সরড টেপ। চাপ দিয়ে বা ঘুরিরে ফ্ল্যাশ করতে হবেনা।

এখনে একটা কথা গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের দেশেও শুরুর দিকে সুন্দর সব ফিটিংস থাকে। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই সেগুলো ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে বিশেষত নিয়মিত পরিচর্যার অভাবে।

কিন্তু কলকাতা এয়ারপোর্টে সারাক্ষণই বাথরুম পরিস্কার রাখার জন্য লোক আছে। কিছুক্ষণ পর পর এসে পরিস্কার করে যায়।

ঐ বার কাজের ফাকে ফোরাম শপিং মলে গিয়েছিলাম সুলতান মুভি দেখার জন্য। ইনোক্স সিনেপ্লেক্স এ মুভি দেখেছিলাম।

সেখানে বাথরুমে গিয়ে নতুন একটা সংযোজন দেখে ভালো লেগেছিলো। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন তো ছিলোই সাথে বড়দের জন্য কমডের পাশে বাচ্চাদের জন্যও একটা কমড দেখতে পেয়েছিলাম।

এটা দেখে মাথায় আইডিয়া আসে ছবি তোলার। সাথে সাথে পকেট থেকে মোবাইল বের করে ছবি নিয়ে নিলাম কয়েকটা যাতে করে পুরু বাথরুমের চিত্রটা চলে আসে।

তারপর আবার গত ডিসেম্বরে কলকাতা যাই তিন দিনের জন্য।

প্রথম দুই দিন সকাল-সন্ধ্যা ট্রেইনিং। তাই দিনের আলো দেখার আর সু্যোগ হতো না।

সন্ধ্যার পর প্রতিদিন মুভি দেখার জন্য পাশেই কোয়েস্ট শপিং মলে চলে যেতাম। প্রথম দিন দেখেছিলাম শহ রুখ খানের ‘ডিয়ার জিন্দেগী’ এবং দ্বিতীয় দিন দেখেছিলাম বিদ্যা বালানের ‘কাহানি টু’।

মুভি শুরু হয়ে যাওয়ার আগে বাথরুম খুজছি। বাথরুমে যাওয়ার সময় খুব সচেতন থাকি যাতে করে লেডিস কর্নারে ঢুকে না পড়ি। তাই কোন সাইন বা লেখা থাকলে ভালোভাবে দেখে ঢুকি। তেমনি যখন দেখলাম উপরে লেখা জেন্টলম্যান তখন বুঝলাম এটাই হয়তো ছেলেদের বাথরুম।

এতোদিন ম্যান, বাথরুম, ওয়াশরুম, টয়লেট, শৌচাগার ইত্যাদি বিভিন্ন নামে শুনেছি বা দেখেছি। কিন্তু এই নামটা এই প্রথম দেখলাম। খুব ভালো লাগলো।

ভেতরে ঢুকে আরো ভালো লাগলো। চতুর্দিকে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে কমড। চকচকে ফ্লোর তেমনি ঝকঝক এ গ্লাস। গ্লাসের দিকে তাকিয়ে দেখি নিজের গায়ের কালো রঙ অনেকটা উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। মনে মনে অফসোস হলো এখানে যতটুকু ফর্সা দেখাচ্ছে এমনটা যদি সব সময় দেখা যেতো তাহলে আমাকে কতোইনা ভালো দেখাতো!

ঘুরে ঘুরে কয়েকটা ছবি নিয়ে বের হয়ে আসি।

বাংলাদেশে শুধুমাত্র বসুন্ধরা শপিং মলে সরাক্ষণ পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজকরতে দেখা যায়। তাই যাওয়ার উপযোগী। কিন্তু যমুনা ফিউচার পার্ক এর অবস্থা ভালো না। মনে হয়েছে নিয়মিত পরিস্কার করা হয়না। আর বাকি শপিং মলগুলোর বাথরুমের অবস্থা কেমন তা আর বলার দরকার নেই আশা করছি।

শেষ দিন সকালে এক ভদ্রলোকের সাথে দেখা করার জন্য স্যাটারডে ক্লাবে যাই। কলকাতার যতোগুলো ঐতিহাসিক ক্লাব আছে স্যাটারডে ক্লাব তার মধ্যে অন্যতম।

তিনি আমাদের চারজনকে চা খাওয়ালেন।

চা খাওয়ার ফাকে ইনডিয়াতে ৫০০ এবং ১,০০০ টাকার নোট কেন বাতিল হলো, এতে করে সাধারণ মানুষের যে অনেক ক্ষতি হয়ে গেলো তা আলাপ করছি। আমরা আরো জানার জন্য যার যার প্রশ্ন ছিলো তা একে একে করছি। তিনি ধৈর্য নিয়ে আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন।

রাজ্জাক ভাই, আরিফ ভাই, রেদোয়ান এবং আমি কিছু সময়ের জন্য অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ হয়ে গেলাম।

কথা প্রায় শেষ দিকে এবার আমার পালা বাথরুমে যাওয়ার। আমি উঠে হাটা শুরু করবো এমন সময় ভদ্রলোক হয়তো বুঝতে পেরেছেন আমি কেন উঠেছি। সাথে সাথে বললেন, বাথরুমে যাবেন তো। এদিক দিয়ে সোজা গিয়ে হাতের ডানে যাবেন। একটু গেলেই সামনে বাথরুম পড়বে।

তার দেখানো পথ ধরে খুব সহজেই বাথরুম পেয়ে গেলাম। এটাও খুবই পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। বাংলাদেশে ঢাকা ক্লাব-এ গিয়েছি কয়েকবার। কিন্তু এতো অল্প সময়ের জন্য গিয়েছি যে বাথরুমে যাওয়ার সু্যোগ হয়নি। আর গুলশান ক্লাবে গিয়েছিলাম একবার। সেখানেও বাথরুমে যাওয়ার সুযোগ হয়নি।

আমাদের দেশে বাথরুমে সব সময়েই মানুষ থাকেই।

কিন্তু সেখানে প্রায় সময়ই ফাকা থাকে।

তাই আমার বাথরুমের ছবি তুলতে গিয়ে কোন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। কেউ দেখেনি আমি বাথরুমের ছবি তুলছি।

তবে স্যাটারডে ক্লাবে যখন শেষ ছবিটা তুলছি তখন হঠাৎ করে একজন পরিচ্ছন্ন কর্মী ঢুকে পড়েন। এবং তিনি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে চলে যান। আমিও সাথে সাথে বের হয়ে চলে আসি।

যেদিন বাংলাদেশে চলে আসি সেদিন লাগেজ নেয়ার জন্য এয়ারপোর্টে বেল্টের সামনে দাড়িয়ে অপেক্ষা করছি। ভাবলাম যেহেতু লাগেজ এখনো বেল্টে আসেইনি এই ফাকে বাংলাদেশের এয়ারপোর্টের কমন বাথরুম দেখে আসি।

এর আগে যতোবারই বাংলাদেশে এয়ারপোর্টে গিয়েছে ততোবারই ইবিএল স্কাই লাউঞ্জ ব্যবহার করেছি। তাই কমন বাথরুমে আর যাওয়া হয়নি।

কমন বাথরুমে গিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারিনি।

মোটামোটি নিন্মমানের। অনেকেই ঢুকছেন।

হাতে একজন টিস্যু পেপার নিয়ে দাড়িয়ে আছেন। লক্ষ্য করলাম একজন তার কাছ থেকে টাকা দিয়ে টিস্যু নিলেন। এতো মানুষ ছিলো যে এখানে আর বাথরুমের ছবি তোলার সু্যোগ হলো না।

তবে আশার কথা হলো, ঢাকাতে অত্যাধুনিক পাবলিক টয়লেট উদ্বোধন হয়েছে কয়েক মাস আগে।

টয়লেট উদ্বোধন করতে গিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পরেশনের মেয়র বলেছেন, “এতো সুন্দর টয়লেট আমার-আপনার বাড়িতেও নাই। আমার মনে হয়, দেশ যারা চালান- প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে এতো সুন্দর টয়লেট নাই”।

একই অনুষ্ঠানে সুইডেনের রাষ্ট্রদূত টয়লেটের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে বলেন, এই ধরনের টয়লেট চারটি কারনে দরকার। জনস্বাস্থ্য, লিঙ্গ সমতা, মহিলাদের নিরাপত্তা এবং শহরের সৌন্দর্য রক্ষা।

এর আগে এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, ঢাকায় গণশৌচাগার একটা মহাসমস্যা। তিনি আগামী বাজেটে এর উপর নজর দেয়ার কথা বলেন।

তবে যতো কিছুই করা হোক সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে নিয়মিত পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার উপর। কেবল তখনই বাথরুম সম্পর্কে আমাদের মনে ভয়ানক চেহারে ভেসে উঠবে না।

You Might Also Like

No Comments

Leave a Reply

shares
error: Content is protected !!